মাথা ব্যাথার কারণ কি? দ্রুত মাথা ব্যাথা কমানোর কিছু ঘরোয়া উপায়

Ways to reduce headache in Bengali
আমাদের পৃথিবীতে খুব কম মানুষ রয়েছেন যাদের মাথা ব্যথা নেই। পৃথিবীর সব বয়সের মানুষেরই মাথা ব্যথা হতে দেখা যায়। ৬৫ থেকে ৭৮ শতাংশ লোকেরই এই সমস্যা হতে দেখা যায়। যখন মাথা ব্যথা হয় তখন আর কিছুই ভালো লাগে না। জীবনের যে কোনো সময়েই মানুষ এই সমস্যার সম্মুখীন হন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন মাথা ব্যথা অনেক কারণেই হতে পারে। বেশি মানসিক চাপ পড়লে, সর্দিতে মাথা ব্যথা, অফিসে কাজ করতে করতে হঠাৎই মাথা ব্যথা, সকালে ঘুম থেকে উঠেই মাথা ব্যথা এই সব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। কিন্তু সময় মত গুরুত্ব না দিলে মাথা ব্যথা একটা রোগে পরিণত হয়।

আমরা অনেক সময় মাথা ব্যথা বলতে বুঝি, পুরো মাথাটা ব্যথা। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল। মাথার যে কোনো নির্দিষ্ট অংশে এই ব্যথা হতে পারে। কোথায় মাথা ব্যথা হচ্ছে সেটা আগে নির্বাচন করা দরকার। তবে নয় মাসে ছয় মাসে একবার মাথা হলে অসুবিধার কিছু নেই।

কিন্তু যদি প্রায়শই ব্যথা হয়, তাহলে সেটার উপর গুরুত্ব আবশ্যক। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, অপর্যাপ্ত ঘুম, কম্পিউটার বা মোবাইল বেশি ব্যবহারের কারণে এই সমস্যাটা হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রায় ৩০০ রকমের মাথা ব্যথার কথা লেখা আছে। মাথা ব্যাথার পিছনে কোন কোন কারণ থাকে জেনে নেওয়া যাক।

টেনশন হেডেক (Tension Headache)

সাধারণত মাথার পিছনে হয়। মাথার পিছনে অর্থাৎ ঘাড়ের সামান্য উপরে হয়। প্রথমে মাথাটা ভারী হয়ে যায়। এরপর কাঁধ এবং গলা শক্ত হয়ে যায়। তারপর ব্যথা শুরু হয়। অনেকসময় এই ব্যথা কপালেও হয়। এই ব্যথা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হল টেনশন। টেনশন ফ্রি হলেই ব্যাথা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

চোখের জন্য মাথা ব্যথা

চোখের সমস্যা এখন সবার। বাচ্চা থেকে বুড়ো সকলেরই এই সমস্যা হতে দেখা যায়। চোখের সমস্যার কারণেও মাথা ব্যথা হয়। এক্ষেত্রে কপালে ব্যথা হয়।

সাইনাসের ব্যথা

সাইনাস হল মাথার ভিতরে থাকা একটি বায়ু ভর্তি কুঠুরি, এই কুঠুরির জন্য আমাদের মাথা হালকা থাকে। কিন্তু কোনো কারণে সংক্রমণ হলে মাথার ভিতরে সমস্যা তৈরি হয়। তীব্র ব্যথা হয়। আর তাই যখন মাথা ব্যথা হয়, তখন এর পাশাপাশি নাক দিয়ে জল গড়িয়ে যায়, কানে ব্যথা হয়, জ্বর হয়, মুখ ফুলে যায়।

মাইগ্রেন

এই রোগ সম্পর্কে সকলেই জানেন। প্রথমে যখন এই ব্যথা শুরু হয়, তখন একটি নির্দিষ্ট জায়গাতেই শুরু হয়, পরে ধীরে ধীরে এই ব্যথা মাথা ছাড়িয়ে চোখেও চলে আসতে পারে। আর তাই একে আধ-কপালি ব্যাথা ও বলা হয়।

ক্লাস্টার হেডেক (Cluster Headache)

দিনের বিভিন্ন সময়ে হতে পারে এই ব্যথা। চোখের চারপাশটা জ্বলতে থাকে, চোখ শুকনো হয়ে যায়, চোখ লাল হয়ে যায়, চোখ থেকে জল গড়ায় । এই ব্যথা ১ সপ্তাহ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত হয়। এই মাথা ব্যথা সুইসাইড হেডেক নামেও পরিচিত। নারীদের চেয়ে পুরুষদের হতে দেখা যায়।

থান্ডারক্ল্যাপ হেডেক

এই ব্যথার ক্ষেত্রে মাথায় যেন বজ্রপাতের অনুভূতি হয়। এই ব্যাথা খুবই তীব্র হয়। কিন্তু সময়সীমা ৫ মিনিট।

এয়ারপ্লেন হেডেক

অনেকের আকাশ পথে ভ্রমণের সময় মাথা ব্যথা হতে থাকে। যাকে এয়ারপ্লেন হেডেক বলে। গবেষণায় জানা গেছে প্লেনে ওঠা প্রতি ১২ জন লোকের মধ্যে ১ জনের এই সমস্যা দেখা যায়।

ব্রেন টিউমার

মাথার যেদিকে টিউমার হয়, সেদিকেই ব্যাথা হয়। টিউমার ছোটো থাকলে ব্যথা হয়না, বড় হলেই ব্যথা হয়।

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার জন্যও মাথা ব্যথা হয়। গ্যাসের কারণে মাথাব্যথা খুবই যন্ত্রণা দায়ক। একদিকে গ্যাস আর একদিকে মাথাব্যথা। তাই খাবার খাওয়ার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে এমন কিছু না খাওয়া, যাতে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়।

ডাক্তারের কাছে কখন যাবেন? - মাথা ব্যাথার ঔষধ

সকলেই মাথা ব্যাথাকে প্রথম দিকে গুরুত্ব দিই না। মাথা ব্যথা হলে প্রথমদিকে ঘরোয়া ওষুধ বা বাজার চলতি ওষুধে কাজ চালিয়ে দিই। কিংবা অনেক সময় একটু বিশ্রাম নিলেই শরীর সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু যখনই এই ব্যথা তীব্র হবে, তখনই ডাক্তারের কাছে যান। মাথা যন্ত্রণার সঙ্গে জ্বর, বমি, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা, হাত-পায়ে সাড় চলে যাওয়া, ঝিমিয়ে যাওয়া, চেনা মানুষকে চিনতে না পারা এইসব লক্ষণ দেখা দিলে খুব তাড়াতাড়ি ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।

ঘরোয়া উপায়ে মাথা ব্যথা কমানোর উপায় 

  1. যাদের মাইগ্রেন আছে, তারা প্রথম কয়েকদিন মাথা ব্যাথার জন্য ওষুধ খান। তারপর ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে, লাইফস্টাইল ঠিক করতে হবে। খালি পেটে বেশিক্ষণ থাকা যাবেনা, রাত জাগা যাবেনা, হঠাৎ করে রোদে বেরানো যাবেনা, অতিরিক্ত ঘুমানো যাবেনা, ছ-সাত ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। বেশি করে জল খেতে হবে। স্ট্রেস নেওয়া যাবেনা, হাঁটাহাঁটি করতে হবে।
  2. রোজ নিয়ম করে ৮ গ্লাস জল খেতে হবে। শরীরকে হাইড্রেট রাখতে হবে। মাথা ব্যথা হলেই ইষদুষ্ণ গরম জল খান। বেশি করে লিকুইড জাতীয় খাবার খান। ডাবের জল, জুস, স্যুপ বেশি করে খান। চা-কফি কম খান।
  3. অপুষ্টি থেকেও মাথা ব্যথা হতে পারে। তাই সুষম আহার প্রয়োজন। তাই রোজ এমন খাবার খান যেখানে ভিটামিন রয়েছে।
  4. মাথা ব্যথা করলে ম্যাসাজ করুন, কপালের দুই পাশের রগ বা ঘাড়ের কাছে আঙুলের ডগা দিয়ে ম্যাসাজ করুন। এছাড়াও আঙুলের ডগায় এসেনশিয়াল অয়েল, পিপারমিন্টের মতো কোনো সুগন্ধি ফ্লেভারের তেল দিয়ে ম্যাসাজ করুন। এই সময় রিল্যাক্সিং কোনও মিউজিক শুনুন।
  5. সবার সঙ্গে মন খুলে কথা বলুন, হাসিখুশি থাকুন।
  6. মাথা যন্ত্রণা কমাতে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাবেন না।
  7. উগ্র গন্ধ যেমন পারফিউম, ধূপধুনো বা রুম ফ্রেশনারের উগ্র গন্ধ থেকে যদি মাথা ব্যথা হয়, তাহলে এসব থেকে দূরে থাকুন।
  8. শক্ত করে চুল বাঁধবেন না। আলগা করে চুল বাঁধুন।
  9. ঘরের আলো বন্ধ রাখুন, কম্পিউটার স্ক্রিন, ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকুন।
  10. চায়ে আদা-লবঙ্গ ও মধু মিশিয়ে খান মাথা ব্যথা কমবে।
  11. মাথায় তীব্র ব্যথা হলে ঠান্ডা জল ঢেলে স্নান করুন।
  12. মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন। মদ রক্তনালীকে বড় করে দেয়, মদ থেকেই কিন্তু ক্যানসার হয়। আর তাই এই জিনিসটা থেকে দূরে থাকুন।
  13. বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুল এবং তর্জনির মাঝখানের অংশে অন্য হাতের বুড়ো আঙ্গুল ও তর্জনি দিয়ে চাপ দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ম্যাসাজ করতে হবে , দেখবেন নিমেষেই মাথা ব্যথা উধাও।
  14. কিছুটা লবঙ্গ শুকনো খোলায় গরম করে নিন, এরপর রুমালে বেঁধে শুকতে থাকুন। তাহলেই দেখবেন ব্যথা ধীরে ধীরে কমে যাবে।
  15. আইসব্যাগে বরফ নিয়ে মাথার উপরে বা কপালে ধরে রাখুন। ১৫ মিনিট ধরে এই কাজটি করুন তাহলেই দেখবেন মাথা ব্যথা কমে যাবে। আর যদি বরফ না থাকে, তাহলে ঠান্ডা জলে স্নান করুন।
  16. যাদের ঘুম থেকে উঠেই মাথা ব্যাথার সমস্যা রয়েছে, তারা প্রতিদিন সকালে একটি লেবুর রস হালকা গরম জলে মিশিয়ে পান করুন, তাহলে দেখবেন উপশম হবে।
  17. প্রতিদিন ৭-৮টি তুলসি পাতা চিবিয়ে খান।
  18. সাইনাসের সমস্যায় ঘাড়ে, মাথার পিছনে গরম জলের সেঁক দিতে পারেন।
  19. দারুচিনির পেস্ট বানিয়ে কপালে ৩০ মিনিট রাখুন, তারপর ধুয়ে ফেলুন। মাথার যন্ত্রণা থেকে আরাম পাবেন।
  20. অতিরিক্ত ক্যাফিন, অ্যালকোহল, চকোলেট, পনির, বাদাম, প্রক্রিয়াজাত মাংস এড়িয়ে চলুন। ডিম, কলা, মাছ, ডাল , লেবু এইগুলো নিয়মিত খাদ্য তালিকায় রাখুন। হার্বাল চা পান করতে পারেন।
  21. নিয়মিত এক্সারসাইজ করলে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পাবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url